বড় নেতা নেই, বড় শিল্পী নেই, বড় শিক্ষক নেই, বড় ক্রীড়াবিদ নেই—
অথচ নেতা আছে অজস্র, শিল্পী আছে অজস্র, বিশেষজ্ঞের অভাব নেই, বক্তারও নয়।
তাহলে এত মানুষ…
কিন্তু বড় মানুষ কোথায় গেল?
এই প্রশ্নের উত্তরটা আশ্চর্যভাবে লুকিয়ে আছে একটা মাছের মধ্যে।
ইলিশ।
আর তার ঠিক উল্টো দিকে আছে আর-একটা মাছ—
তেলাপিয়া।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী অনেক আগেই লিখেছিলেন—
“ইলিশ তোমাকে দেখিনা, শুধুই তোমার স্বপ্ন দেখে…”
তিনি তখন কবিতা লেখা শেখাচ্ছিলেন।
কিন্তু আজ, সেই সামান্য কয়েকটি লাইনের দিকে তাকালে মনে হয়—
ইলিশ আর তেলাপিয়ার গল্পটা শুধু মাছের গল্প নয়।
এটা আমাদের সময়ের গল্প।
কবিতা লেখা শেখানোর জন্য কবিতা লিখেছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। আর তাতে ছিল ইলিশের কথা। এই মুহূর্তে আমাদের দেশের যা হাল, রাজনীতি তথা সমাজ জীবনে, তাতে ওই সামান্য কবিতার মধ্যে চেষ্টা করলেই দেশের একটা ছবি আমরা পেতে পারি। আর সেখানেও বোঝা যাবে, ইলিশ আমাদের সংস্কৃতিতে কতটা জায়গা জুড়ে রয়েছে।
কবিতাটি এই রকম ঃ ইলিশ তোমাকে দেখিনা, শুধুই তোমার স্বপ্ন দেখে / সপ্তাহ মাস বৎসর যায়, দুঃখ বিদরে হিয়া / সান্ত্বনা দিতে নেই পাকা রুই, সে-ও বহুকাল থেকে / নিখোঁজ, এখন বাজার জমায় / রাশি রাশি তেলাপিয়া।’
সত্যিই নেই! ইলিশ এখন এতই মহার্ঘ যে, সব বিত্তের ঘরে সে আর আসে না। বাজারে যেদিন আসে, চড়া দামের সঙ্গে সঙ্গে এ খবরও বাঙালির কানে পৌঁছয় যে ইলিশ ‘উঠেছে’ আজ।
মহারাজের মতো বা মহারানির মতো ইলিশ। রাজকীয়। অভিজাত। অন্য রকম। বুদ্ধদেব বসুর ব্যাখ্যায়, জলের উজ্জ্বল শস্য’। আবার আমাদের সমাজ জীবনেও ইলিশের মতো ‘বড়’ অভিজাত কেউ নেই। কোনও সর্বজনগ্রাহ্য মুখ নেই কোথাও। বদলে পাড়ায় পাড়ায় নেতা। বিভিন্ন দল উপদলের নেতা। রাজনীতি, সংস্কৃতি, খেলার মাঠ - একেবারে যথার্থ - রাশি রাশি তেলাপিয়া। এখন বাজার দখল হয়ে গেছে পাড়ার কুচো নেতাদের হাতে। সমস্ত বাজার। সংস্কৃতি থেকে রাজনীতি, শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, মিডিয়া থেকে বিনোদন।
ইলিশ চর্চায় অন্য সব কিছু দ্বাদশ ব্যক্তি। সুতরাং ইলিশেই ফেরা যাক।
বছর কয়েক আগে লক ডাউনের জন্য বিশ্বজোড়া আবহাওয়ার এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন দেখা গেছিল। মার্চের শেষ থেকে শুরু হয়েছিল লক ডাউন, আর এপ্রিলের প্রায় মাঝামাঝি থেকে নোনা জলের মা ইলিশেরা ঝাঁকে ঝাঁকে এসে ঢোকে মিষ্টি জলের গঙ্গায়।
ইলিশের নিবাস সমুদ্রের গভীরে। অর্থাৎ নোনা জলে। এদিকে তার ডিম পাড়ার জায়গা মিষ্টি জলের অভ্যন্তরে। নোনা সমুদ্র থেকে রীতিমতো ৫০০ কিমি উজান বেয়ে সাঁতরে আসে মা ইলিশ। তখন তার পেটে থাকে ডিম। সে সময় ইলিশ ধরা মানে ইলিশের প্রজননে আঘাত। আর সেই অন্যায়টিই হয়ে এসেছে বছরের পর বছর।
কানুন বলছে, প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল থেকে ১৪ জুন এলিশ ধরা নিষিদ্ধ। কিন্তু কে শোনে সে কথা। প্রতি বছরই দূষিত গঙ্গার কারণে এবং আমাদের লোভের কারণে অসংখ্য খোকা ইলিশ ধরা পড়ে জেলেদের জালে। লক ডাউনের সময় জেলেরাও ছিল লকড। কল কারখানা দীর্ঘ দিন ছিল স্তব্ধ। ফলে গঙ্গার জলের দূষণ কমে নির্মল এক আমেজ এনেছিল ইলিশের ঝাঁকে। জলের স্বচ্ছতার জন্য এবং খামোকা বেয়াইনি ভাবে খোকা ইলিশ না ধরার জন্য অন্যান্য বছরের তুলনায় লক ডাউনের সময় ইলিশ হয়তো বেশিই এসেছিল বাজারে।
লক ডাউন তথা নির্মল আবহাওয়ার কথা এখানে উল্লেখ করার কারণ আর কিছুই নয়, পাঠক অন্তত এটা বুঝুন, বাঙালির প্রাণের ইলিশ আসলে প্রতি বছর কতই না দূষিত জল সাঁতরে এসে পৌঁছয় আমাদের দরবারে।
লক ডাউন অতীত। এ বছর আবার আগের মতোই স্বাভাবিক। অর্থাৎ গঙ্গার জল দূষিত ও ভাল নয়।
কিন্তু তবু আসছে তারা, বাঙালির প্রাণের ইলিশ !!!!
তবে দাম আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আসার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। সে যত বড়ই ইলিশ জেলেদের জালে উঠুক, কবি নীরেন্দ্রনাথের বহুদিন আগে লেখা ‘কবিতার ক্লাসে’র না দেখা ইলিশই বরং প্রকৃত সত্য। আরও সত্য, রাশি রাশি তেলাপিয়ার ‘বাজার’ ঢেকে থাকা।
‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে, ময়ূরের মতো নাচে রে .......
‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে, ময়ূরের মতো নাচে রে ....... রবীন্দ্রনাথের এই কবিতার দারুণ এক প্যারডি লিখেছিলেন টেনিদা স্রষ্টা নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায়। সে কবিতা প্রকাশ হয়েছিল আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে শারদীয়া কিশোর ভারতীতে। কবিতায় ইলিশের উল্লেখ করেছিলেন নারায়নবাবু দুর্দান্ত স্বাদে ও গন্ধে।
ঘোর বর্ষা নেমেছে। ঘরের বাইরে বৃষ্টির শব্দ, এক নাগারে। রসিক কবি বসে বসে নানান খাবারের কথা ভাববেন না তো কী অন্যব কিছু ভাববেন!
তো ভাবনাটা এরকম ঃ হিঙের খিচুড়ি রাঁধিছে গৃহিণী / হাতা বোকনায় বাজে ঠিনি ঠিনি / খিচুড়ির সাথে সোনায় সোহাগা / ইলিশের ভাজা আছে রে / হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচেরে......
জয় ইলিশের জয় ঃ একটা সত্যি গল্প
অবাঙালি ব্যবসায়ী থাকেন কানপুরে। আগে ছিলেন কংগ্রেস, মধ্যে বলাই বাহুল্য ইউ পিতে ‘বুল্ডোজার’ বিজেপিতে। চব্বিশের ভোটে, ব্যবসায়ী মানুষ, হাওয়ার অভিমুখ ধরে এই মুহুর্তে ‘সপা’য়। অবাঙালি ব্রাহ্মণ নিয়ম নিষ্ঠায় বেশ কড়া। কিন্তু সুরা পান তথা মদ্যপানের সময় নিয়মের অদ্ভুত একটা ব্যতিক্রম হরিরামের। বৃহস্পতিবার হলেই, চাট হিসেবে মাছ ভাজাটা তার মাস্ট। হরিরাম ত্রিপাঠি। উত্তর প্রদেশ বাংলা ও বিহার জুড়ে তার সাপ্লাইয়ের ব্যবসা।
বাঙালিদের নিজস্ব ব্র্যান্ড ইলিশ নিয়ে অবাঙালিদের একটা মৃদু অভিযোগ আছে। তা হলো, মছলি কামালকা টেস্টি তো হ্যায়, বাট কাঁটা বহুৎ। বাঙালি বন্ধুদের হরিরামও জিগ্যেস করেছিল, কাঁটা বাছা হয় কী ভাবে!
‘ইলিশ মাছের কাঁটা সহজে বাছুন’ বলে কোনও বই তো শিয়ালদা হাওড়ার লোকাল ট্রেনে এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সুতরাং হরিরামের বাঙালি বন্ধুরাও তাকে তেমন ভাবে বুঝিয়ে উঠতে পারেনি, অত খুদি খুদি কাঁটা কী ভাবে বেছে খেতে হয়!!!!!
অনেক দিন আগে একবার কলকাতায় এসে প্রথম ইলিশ খেয়েই সে মাত হয়েছিল – এ গল্প সে হামেশা করে। কলকাতায় এসে ইলিশের স্বাদ হরিরামের মুখে এমন ভাবে লেগে গেল যে কানপুরে পৌঁছে প্রথম দিনেই সে ‘পাত্তা লাগালো’ ইলিশ সে শহরে কোথায় পাওয়া যায়।
দেখা গেল পাওয়া যায় ভালই।
নিষ্ঠাবান উত্তরপ্রদেশিয় বামুন ‘হলশে’র (তার নিজস্ব উচ্চারণে) ভক্ত হয়ে উঠল এরপর। বর্ষার সময় প্রত্যেক বৃহস্পতিবার তার ইলিশ চাইই।
হরিরামের পিপের মতো চেহারা। রোজই সন্ধ্যে নাগাদ মদ্যপানের একটা ব্যবসায়িক ঠেক তৈরি করে নিজের অফিসের বিশেষ একটা জায়গায়। ইলিশ মাছ কড়কড়ে করে ভাজা সামনে সাজানো থাকে একটা প্লেটে একটার পর একটা। সঙ্গে ইলিশের ডিম ভাজা। আর প্রতিদিনই ইলিশের সুখ্যাতি করতে গিয়ে হরিরাম যা বলে, তাতে কোনও অতিশোয়াক্তি নেই। বাংলা করলে তার কথার মানে দাঁড়ায় – এই মাছের ডিম থেকে সব কিছু সবই অন্য মাছের থেকে আলাদা। সবই অন্য মাছের থেকে অন্য স্বাদের – একেবারে অনন্য স্বাদের। ভাজাও তাই।
বৃগস্পতিবারের সন্ধ্যার নামই সে বদলে করে দিয়েছে – হলসে ইভনিং।
এক বাঙালি বন্ধু হরিকে ভাপা ইলিশের কথা বলেছিল। একবার দই ও অন্যবার সর্ষে ইলিশ খাইয়েছিল নিজের হাতে কাঁটা বেছে দিয়ে। সব সময় নিজের জাত ও ভাষা নিয়ে গর্বিত হরিরাম জীবনে ওই একবারই বলেছিল, ইলিশের কারণে, স্রেফ ইলিশেরই কারণে আগামী জন্মে তার মুড়ি খোর বাঙালি হয়ে জন্মাতে কোনও আপত্তি নেই!!!!
শুধুই ইলিশের জন্য কিন্তু। শুধুই ইলিশ মাছ তাকে করে তুলেছে বাঙালির বন্ধু।
অর্থাৎ - জয় ইলিশের জয়।
ইলিশের পরাজয়ও আছে!!
একটা প্রচলিত গল্প।
শহরের ছেলে বিয়ে করেছে গ্রামের মেয়েকে। বর্ষায় ইলিশ খাওয়ার জন্য মেয়ে-জামাইয়ের ডাক পড়েছে ছুটির দিন। মোটামুটি পৌনে দু কিলোর দুর্দান্ত ইলিশ আনতে পেরেছেন শ্বশুর মশাই। জামাইয়ের থেকেও অত ওজনের ইলিশের গর্বে তাঁর বুক ফুলে ছাপ্পান্ন ইঞ্চির থেকেও বেশি।
পেট পুরে ইলিশ সাঁটিয়ে দিবানিদ্রার সামান্য পরেই জামাই বাবাজি বুঝল, নোলা ঝেড়ে অতগুলো পিস খাওয়া মোটেই উচিত হয়নি। পেট গরম হয়ে গেছে তার নানা পদের ইলিশ খেয়ে। আরও কিছুক্ষণ পর সে যাকে বলে ‘উপলদ্ধি’ করতে পারল, বড় ভুল হয়ে গেছে – পেটের মধ্যে শ্রাবন মাসের মেঘের ডাকাডাকি!!!
খবর পেয়ে শ্বশুর মশাই অবশ্য তেমন উদ্বিগ্ন হলেন না। বরং লোক ডেকে বাড়ির সামনের গাছ থেকে কচি ডাব পেড়ে জামাইকে দিলেন খেতে।
এবং আশ্চর্য! কিছুক্ষণ পরে জামাইবাবাজীবনের পেট এক্কেবারে নর্মাল।
গালে হাত দিয়ে জামাই তখন ভাবতে বসল, জলের অত নীচে ঠাণ্ডায় থাকে ইলিশ। সেটা খেয়ে তার পেট হলো গরম। আর সারাদিন রোদে পুড়ছে যে ডাব, তার জল খেয়ে পেট হলো ঠাণ্ডা।
তাজ্জব ব্যাপার রে ভাই!!!
‘হারকে ভি জিতনেওয়ালেকো, বাজিগর কহতে হ্যায়’
হেরেও ইলিশ কীভাবে জেতে, তার আর একটা অতি প্রাচীন ও বহুল প্রচলিত গল্প – বাজিগর সিনেমার ক্যাচ লাইনটা দিতেই হলো।
এ গল্প পড়ার পর যে কারোর মনে হতে পারে, এ গল্প এখন আর চলে না। কারন যে বস্তুটির সঙ্গে ইলিশ বদলের গল্প, দামের দিক দিয়ে ইলিশ এখন এতই মহার্ঘ, যে এই গল্পে পোষাবে না।
গল্পটা অনেকেই জানে, তবু আর একবার বলা যাক – দাদা ডিউটি বের হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে এক ছোকড়া হাতে একটা ইলিশ নিয়ে দরজায় কড়া নাড়ল।
কী ব্যাপার?
না, দাদা অফিস যাওয়ার সময় এটা কিনে পাঠালো। আর বলল, বাড়ির সাইকেলটা নিয়ে আসতে।
ইলিশ দেখে গিন্নির কোনও সন্দেহ হলো না। সুতরাং অচেনা হলেও ছেলেটিকে সাইকেল নিয়ে যেতে দিল। রাতে বাড়ি ফিরে দাদা জানল, তার সাইকেল বেহাত হয়ে গেছে একটি ইলিশের বিনিময়ে।
না, এখন কোনও চোরেরই ইলিশে ইনভেস্ট করে সাইকেল হাতিয়ে লাভ নেই। একটি জম্পেশ ইলিশের দামের ত্রিসীমানায় আসবে না চোরাই সাইকেলের দাম!!!
ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সঙ্গে ইলিশের আবার জয় পরাজয়ের একটা সম্পর্ক আছে। পালতোলা নৌকোর সওয়ারী মোহনবাগানীরা অবশ্য ম্যাচ জিতলে বলত, নৌকোর ওপর থেকে জাল ফেলে ইলিশ ধরেছি রে ...। এখন অবশ্য বিশ্বকাপ বা মেসি-রোনাল্ডোদের দৌলতে বাঙালির স্বাদ বদল হয়েছে ফুটবলে। রাত জেগে বাঙালি যে মানের ফুটবল দেখে, মোহন-ইস্টের খেলা তার তুলনাতেই আসে না।
মোহন-ইস্ট বা ডার্বি – সে ডার্বি আর নেই – কিন্তু ইলিশ থেকে গেছে স্বমহিমায়। যদিও ইলিশ হাতে ঝুলিয়ে দোলাতে দোলাতে কত্তার বাড়ি ফেরার দৃশ্যও শেষ হয়ে গেছে অনেকদিনই। এখনকার বাচ্চারা তো বটেই, ত্রিশ পঁয়ত্রিশের যুবক যুবতীরাও ও দৃশ্য দেখেছে কী না সন্দেহ। ইলিশ ক্রমে বাঁধনছাড়া দামে পৌঁছে গেছে কয়েক বছর হলো। অথচ এমন নয় যে, হাজার বারোশ’ টাকার ইলিশ অবিক্রীত পড়ে থাকে। থাকে না, কারণ বাঙালির একটা অংশের ক্রয় ক্ষমতা বেড়ে গেছে বিস্তর। এবং সেটা খুব ছোট অংশ হলেও সংখ্যায় বাজারে আসা ইলিশের থেকে বেশি! এখন ইলিশ ক্রমে ভোজন রসিক বাঙালির পাত থেকে দূরে সরে গিয়ে স্রেফ পয়সাওয়ালার ঘরের জন্য। (তাবলে কী পয়সাওয়ালা হলেই বেরসিক নাকি? তা অবশ্যই নয়)
ঠিক যেমন মা লক্ষ্মী। বস্তিতেও মক্ষ্মী পুজো হয় একশ শতাংশ নিষ্ঠা ভরে। জাঁক জমক করেই হয়। কিন্তু বছরের পর বছর বস্তি একই রকম থাকে, বস্তি বস্তিই থাকে। ওদিকে মা লক্ষ্মী অবস্থান করেন আম্বানিদের বিশাল বাড়িতে। সেখানে সারাদিন কুল কুল এয়ারকন্ডিশনড !!
সুতরাং ইলিশের সঙ্গে মা লক্ষ্মীর সম্পর্ক, গোদা বাংলায় যাকে বলে জমে ক্ষীর। (লক্ষ্মী পুজোয় ইলিশ ভোগ বলাটা অবশ্য বেশিই ঠাট্টা হয়ে যাবে)।
ইলিশের প্রচুর পদ নিয়ে বাঙালিদের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রচুর লেখা হয়। কিন্তু ইলিশের একটি বিশেষ রান্না আমি অন্তত আজ পর্যন্ত কোনও পত্রিকায় পড়িনি।
শুনুন সে পদের গল্প।
বাজারে গিয়ে মুখার্জিবাবু যখনই ইলিশ কেনেন, মাছটা কাটিয়ে নিলেও ইলিশের আঁশ ছাড়ান না কখনও। অবাক করার মতো ব্যাপার হলেও মাছওয়ালা এ নিয়ে প্রশ্ন করেনি কখনও। সেদিন জানল রহস্যটা কী।
ইলিশের আঁশ ভীষণই পাতলা, হালকা। আঁশটা ছাড়িয়ে, ভাল করে ধুয়ে, স্রেফ নুন হলুদ দিয়ে মুচমুচে ভাজা করে খেয়ে দেখুন। বুঝবেন, এতদিন আপনি অমৃতের স্বাদ থেকে কত দূরে ছিলেন।
ইলিশের কোনও বিকল্প হয় না। কিন্তু কষ্টকল্পিত বিকল্প খোকাবাবু। মানে ছানা ইলিশ – যার জলের তলায় আরেবহরে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা, সে বেয়াইনি ভাবে মানুষের লোভের জানে ধরা পড়ে চলে আসে বাজারে। দাম কম। স্বাদ কম। এবং এক্কেবারে অনুচিত কাজ একটা।
এখানেও যেন ওই আমাদের বর্তমান সময়ের ছবি দেখতে পাই। সর্বত্র খোকা খোকা আর খোকা। কোত্থাও কোনও বড় মুখ নেই – বড় নাম নেই।
উপকারী ইলিশ
শুধু স্বাদ গন্ধ নয়, ইলিশ মাছের উপকারিতা, পুষ্টিগুন অন্যান্য মাছের থেকে অনেক বেশি।
তবে এই অপূর্ব মাছের জলের খেলা নিয়ে দু চার কথা জেনে নেওয়া যাক।
ইলিশের নিবাস সমুদ্রের গভীরে। অর্থাৎ নোনা জলে। আবার তার ডিম পাড়ার জায়গা মিষ্টি জলের অভ্যন্তরে। নোনা সমুদ্র থেকে রীতিমতো ৫০০ কিমি উজান বেয়ে সাঁতরে আসে মা ইলিশ। তখন তার পেটে থাকে ডিম। সে সময় ইলিশ ধরা মানে ইলিশের প্রজননে আঘাত। আর এই টাই হয়ে এসেছে বছরের পর বছর।
কিন্তু লক ডাউনের বছরে গঙ্গার জল নির্মল হয়ে গেল হঠাতই। আর তার পর এখনও পর্যন্ত জল আগের মতো ততটা বিষাক্ত হয়ে ওঠেনি। এখন জেলেদের চোরাগোপ্তা জাল ফেলায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং সেটা কড়া ভাবে মানা হচ্ছে।। প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল থেকে ১৪ জুন ইলিশ ধরা বন্ধ থাকে। মৎস্য দফতর আশাবাদী সঠিক প্রমান ক্লাসিক সাইজের ইলিশ বাজারে আসবে অনেক আগামী বছরগুলিতে।।
ইলিশ মাছ পরিমিত পরিমাণে ডায়েটে রাখতে পারলে বেশ উপকার পাবেন। ইলিশ একটি তৈলাক্ত মাছ। এই মাছ ফ্যাট,
ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
‘হু’-র নির্দেশিকা অনুযায়ী একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের সপ্তাহে ১৫০ গ্রাম ইলিশ মাছ যথেষ্ট। সেটা ৫০ গ্রাম করে তিন দিনে হলে তো আরও ভাল। তবে মাছটি
আদতে উপকারি হলেও ফ্যাটি অ্যাসিড লিভার, গল ব্লাডার বা হজমের দুর্বলতায় যারা ভুগছেন, তাদের পক্ষে মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। ইলিশের ওমেগাও শরীরে গিয়ে ইপিএ (ইম্পোসা পমপানয়িক অ্যাসিড) ও ডিএইচএ ( ডপোসা হেক্সানাইক অ্যাসিড) – এই দুই ফর্মে ভাগ হয়ে যায় ৷ যেগুলি খুব উপকারি। কিন্তু লিভার বা হজমের দুর্বলতা থাকলে তাদের শরীরে এই দুটি উপাদান সহজে হজম হতে চায় না। ফলে উপকারের চেয়ে অপকার বেশি। বর্ষাকাল ইলিশের মরশুম। পুষ্টিগুণের দিক দিয়ে এই মাছ অন্য সব মাছ থেকে অনেকটাই এগিয়ে।
এখানে ১০০ গ্রাম মাছের পুষ্টিগুণ দেওয়া হল।
প্রোটিন ফ্যাট
২১.৪ গ্রাম ১৯.৪ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেড ২.৯ গ্রাম ক্যালোরি ২৭৩ কিলো ক্যালরি
ক্যালসিয়াম ১৮০ মিগ্রা
আয়রন ২.১ মিগ্রা
ফসফরাস ২৮০ মিগ্রা
সোডিয়াম ৫২ মিগ্রা
পটাসিয়াম ১৮৩ মিগ্রা
ভিটামিন সি ২ মিগ্রা
কাঁচা ইলিশের পাতলা ঝোল অবশ্য সব দিক থেকে নিরাপদ। এতে মাছের খাদ্যগুণ পুরোপুরি বজায় থাকে। ভাজা না হওয়ায় প্রোটিন স্ট্রাকচার নষ্ট হয় না । কোনও মশলাপাতি না থাকায় অতিরিক্ত ফ্যাট যোগ হয় না। আবার চট করে হজমও হয়।
এক সপ্তাহের মধ্যে শুরু হয়ে যাচ্ছে কলকাতা লাইব্রেরীর ভিডিওবাজি। সঙ্গে থাকুন।