রোনালদোর পর্তুগাল হেরেও কি জিতে গেল মেসির আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে?ফুটবল মাঠের লিওনেল মেসি বনাম ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দ্বৈরথ নিয়ে দুনিয়াজুড়ে তর্কের কোনো শেষ নেই। কার কটা ব্যালন ডি'অর, কে কটা ট্রফি জিতলেন, কে বেশি গোল করলেন, এই নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় ওঠা এ দেশে অত্যন্ত চেনা দৃশ্য। কিন্তু ফুটবল মাঠের সেই চিরন্তন লড়াই যদি হঠাৎ আন্তর্জাতিক রাজনীতির কূটনীতিতে গিয়ে আছড়ে পড়ে, তবে কেমন হবে? হ্যাঁ, ঠিক সেটাই ঘটছে। সবুজ মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে আর্জেন্টিনা আর পর্তুগাল এখন ভূরাজনীতির এক অদ্ভুত 'এল ক্লাসিকো' ম্যাচে মুখোমুখি। আর সেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের জ্বলন্ত ইস্যু - প্যালেস্টাইন।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, ফুটবল পাগল দুই দেশের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির কী সম্পর্ক? আর মাঠের লড়াইয়ে ট্রফি যাই বলুক, রাজনীতির কূটনীতিতে রোনালদোর পর্তুগাল কি সত্যিই গোল দিয়ে হারিয়ে দিল মেসির আর্জেন্টিনাকে? আপাতদৃষ্টিতে হিসাবটা খতিয়ে দেখলে মনে হবে, আর্জেন্টিনা বোধহয় এই ম্যাচে মস্ত বড় একটা ‘সেলফ-গোল’ খেয়ে বসে আছে।
আর্জেন্টিনার পুরনো 'লিড' এবং এখন সেমসাইড গোলমজার বিষয় হলো, আর্জেন্টিনা কিন্তু এই রাজনৈতিক লড়াইয়ে অনেক আগেই এগিয়ে ছিল। আজ থেকে প্রায় দেড় দশক আগে, ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিনা ফার্নান্দেজ দে কির্চনারের আমলে আর্জেন্টিনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্যালেস্টাইনকে একটি "স্বাধীন ও মুক্ত রাষ্ট্র" হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছিল। কূটনৈতিক মানচিত্রে সেদিনের আর্জেন্টিনা প্যালেস্টাইনকে সমর্থন জানিয়ে বিশ্বের বহু প্রগতিশীল দেশের হাততালি কুড়িয়েছিল। কিন্তু রাজনীতির হাওয়া বদলাতে সময় লাগে না। ফুটবলে যেমন শেষ মুহূর্তের পেনাল্টিতে পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে যায়, আর্জেন্টিনার রাজনীতিতেও ঠিক তেমনটাই ঘটেছে।
আর্জেন্টিনার এখনকার কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ক্ষমতায় আসার পর দেশের এত বছরের বিদেশ নীতিকে এক ঝটকায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিয়েছেন। মিলেই নিজেকে কট্টর ইজরায়েল-পন্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। শুধু মুখের কথাতেই নয়, রাষ্ট্রপুঞ্জের মঞ্চে যখন প্যালেস্টাইনের পূর্ণ সদস্যপদের পক্ষে ভোট নেওয়া হচ্ছে, তখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশের বিপরীতে গিয়ে আর্জেন্টিনা সরাসরি প্যালেস্টাইনের বিপক্ষে ভোট দিয়ে বসেছে! এমনকি আর্জেন্টিনার দূতাবাস তেল আভিভ থেকে বিতর্কিত জেরুজালেমে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও করছেন মিলেই।
দেশের পুরনো ঐতিহাসিক অবস্থানকে এভাবে নস্যাৎ করে মিলেই যে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আর্জেন্টিনাকে একঘরে করছেন, তা বলাই বাহুল্য। আর একেই ফুটবলপ্রেমীরা বলছেন ভূ কূটনীতিতে আর্জেন্টিনার সেমসাইড গোল।
তেল আভিভ আর জেরুজালেম – দুটোই তো ইজরায়েলে। তাহলে বিতর্ক কোথায়?
আসলে তেল আভিভ থেকে জেরুজালেমে দূতাবাস সরিয়ে নিয়ে যাওয়াটা একটা সংকেত।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই ‘সরিয়ে নিয়ে যাওয়া’ অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিতর্কিত।
তার কারণ হলোজেরুজালেম শহরের ওপর মালিকানা বা অধিকার কার, তা নিয়ে ইজরায়েল এবং প্যালেস্টাইনের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলা চরম বিরোধ।
বিষয়টা কেন এত বড় বিতর্কের জন্ম দেয়, তা খুব সহজ ভাষায় বুঝে নেওয়া যাক।
ইজরায়েল পুরো জেরুজালেম শহরকে তাদের "অখণ্ড এবং চিরস্থায়ী রাজধানী" বলে দাবি করে। অন্যদিকে, প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র তাদের ভবিষ্যৎ স্বাধীন দেশের রাজধানী হিসেবে এই জেরুজালেম শহরেরই পূর্ব অংশকে দাবি করে।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এবং রাষ্ট্রসংঘ মনে করে, জেরুজালেমের ভাগ্য কী হবে বা এই শহর কার রাজধানী হবে, তা ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইনের মধ্যে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক শান্তি আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কোনো দেশ একতরফাভাবে একে কারও রাজধানী বলে স্বীকৃতি দিতে পারে না। এই কারণে, বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশ তাদের দূতাবাস ইজরায়েলের তেল আভিভ শহরেই রেখেছে, জেরুজালেমে নয়।
কোনো দেশ যখন তাদের দূতাবাস তেল আভিভ থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নিয়ে যায়, তখন তার কূটনৈতিক অর্থ খুব পরিষ্কার। অর্থাৎ সেই দেশ সরাসরি পুরো জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং প্যালেস্টাইনের দাবিকে পুরোপুরি নাকচ করছে।
এর আগে ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আমেরিকা তাদের দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তেল আভিভ থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৮ সালের মে মাসে । ট্রাম্প অবশ্য এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেছিলেন ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে।
ট্রাম্পের পর জো বাইডেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। বাইডেন প্রশাসন ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেও, তারা দূতাবাসটি পুনরায় তেল আভিভে ফিরিয়ে নিয়ে যায়নি।
ঠিক এখন ২০২৬ সালেও আমেরিকার অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
অর্থাৎ, আমেরিকার দূতাবাস এখনও জেরুজালেমেই রয়েছে এবং আমেরিকা জেরুজালেমকেই ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে চলেছে। তবে বাইডেন প্রশাসন প্যালেস্টাইনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য জেরুজালেমে তাদের একটি আলাদা কনসুলেট খোলার চেষ্টা করেছিল, যা ইজরায়েলের আপত্তির কারণে ঝুলে রয়েছে।
আমেরিকার এই পদক্ষেপের পর গুটি কয়েক দেশ তাদের দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নিয়ে যায়। যেমন গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, পাপুয়া নিউ গিনি এবং কোসোভো। তবে বিশ্বের সিংহভাগ দেশ এখনও আমেরিকার এই নীতি মেনে নেয়নি।
ভারত, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি সহ বিশ্বের প্রায় সমস্ত বড় বড় রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রসংঘ এখনও তাদের দূতাবাস তেল আভিভ শহরেই রেখে দিয়েছে।
তাদের স্পষ্ট অবস্থান হলো জেরুজালেমের ওপর একক অধিকার কারও নয়। দ্বি-রাষ্ট্র নীতি অনুযায়ী আলোচনার মাধ্যমেই এর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিৎ।
তবে সেই ২০১৮তেই বিশ্বজুড়ে প্রবল শোরগোল ও অশান্তি হয়েছিল।
এখন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই যখন ঠিক একই পরিকল্পনা করছেন, তখন তিনি আসলে আন্তর্জাতিক দুনিয়ার অলিখিত নিয়ম ভেঙে সরাসরি ইজরায়েলের পক্ষ নিচ্ছেন। আর এই কারণেই তেল আভিভ থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে জেরুজালেম চলে যাওয়া বেশ বিতর্কের। আর্জেন্টিনার এই একটি পদক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অশান্তির আগুনে আরও ঘি ঢালতে পারে।
পর্তুগালের 'লেট উইনার' গোলঅন্যদিকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দেশ পর্তুগাল এতদিন এই আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বে বেশ সাবধানে, ধীরস্থির পায়ে বল ড্রিবলিং করছিল। হুট করে কোনো পক্ষে না গিয়ে তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পর্তুগাল আন্তর্জাতিক মঞ্চে এক মোক্ষম 'লেট উইনার' গোল দিয়ে দিল। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ঠিক প্রাক্কালে, পর্তুগাল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।
পর্তুগালের প্রেসিডেন্ট মার্সেলো রেবেলো ডি সুজা আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত কড়া ভাষায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফেরানোর একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ হলো 'দ্বি-রাষ্ট্র নীতি'। প্যালেস্টাইনকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মেনে না নিয়ে গাজা ভূখণ্ডে যে স্থায়ী শান্তি স্থাপন সম্ভব নয়, তা পর্তুগাল বুক ঠুকে বিশ্বনেতাদের সামনে বলে দিয়েছে। ফুটবল মাঠে রোনালদো যেমন ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল করে দলকে জেতান, বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে পর্তুগালও ঠিক একইভাবে শেষ মুহূর্তে এসে প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দিয়ে কোটি কোটি মানুষের মন জিতে নিয়েছে।
গ্যালারির বিদ্রোহ: ভক্তরা যখন প্রেসিডেন্টের বিপক্ষে
এই নাটকের সবচেয়ে মজাদার এবং আকর্ষণীয় টুইস্টটি কিন্তু দেখা যাচ্ছে ফুটবল মাঠের গ্যালারিতে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই যতই ইজরায়েলের সমর্থনে রাষ্ট্রপুঞ্জে ভোট দিন না কেন, আর্জেন্টিনার সাধারণ ফুটবল সমর্থকরা কিন্তু তাঁর এই সিদ্ধান্তকে মোটেই ভালো চোখে দেখছেন না। ফুটবল বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বের ম্যাচ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার গ্যালারিতে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
দেশের সরকারি নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আর্জেন্টিনার কট্টর সমর্থকরাই গ্যালারিতে প্যালেস্টাইনের সমর্থনে বড় বড় ব্যানার ও পোস্টার ওড়াচ্ছেন। বুয়েনস আইরেসের রাস্তায় বা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ফ্যানদের হাতে প্ল্যাকার্ড দেখা যাচ্ছে, যেখানে লেখা - "মালভিনাস (ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ) থেকে যেমন ব্রিটিশদের হঠাতে হবে, তেমনই প্যালেস্টাইনকে মুক্ত করতে হবে।" অর্থাৎ, ঘরের মাঠের সমর্থকরাই যখন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে গিয়ে প্যালেস্টাইনের পতাকা তুলে ধরছেন, তখন বুঝতেই হবে যে ফুটবলের আবেগ ও ন্যায়ের লড়াই দেশের কাটখোট্টা রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
মাঠের বাইরে কে জিতল?তাহলে শেষ পর্যন্ত হিসেবটা কী দাঁড়াল? লিওনেল মেসি হয়তো বিশ্বমঞ্চে ট্রফি জিতে আর্জেন্টিনাকে ফুটবল দুনিয়ার শীর্ষে নিয়ে গেছেন। কিন্তু কূটনৈতিক আঙিনায় আর্জেন্টিনার বর্তমান শাসকেরা দেশকে যে দিশাহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, তাতে দেশের সাধারণ মানুষ ও ফুটবল ভক্তদের মাথা হেট হচ্ছে।
বিপরীতপক্ষে, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল ফুটবল মাঠে হয়তো সাম্প্রতিক সময়ে ট্রফি খরায় ভুগছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, ন্যায় ও কূটনীতির মঞ্চে তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাজিমাত করে দিল। পর্তুগালের এই মানবিক ও সাহসী পদক্ষেপ তাদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এক ধাক্কায় অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
তাই ফুটবল মাঠের ট্রফি ক্যাবিনেট যাই বলুক না কেন, ২০২৬ সালের বিশ্ব রাজনীতির জটিল ময়দানে কিন্তু মেসির আর্জেন্টিনাকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়ে রোনালদোর পর্তুগাল স্পষ্ট গোল ব্যবধানে জিতে মাঠ ছাড়ল। ফুটবল ফ্যানদের ট্রোল আর রাজনীতির এই অদ্ভূত জুটিতে আপাতত স্কোরবোর্ড বলছে—রাজনীতির মাঠে সিআরসেভেনের দেশই বিজয়ী!
- অঞ্জন মুখোপাধ্যায়